শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিল যুক্তরাজ্য। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত গণভোটে ব্রিটিশ নাগরিকেরা ইইউ জোটের সঙ্গে ৪৩ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এর পরিণতিতে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে ডেভিড ক্যামেরনকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বনেতারা এ বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাজ্যের বিদায়ের সিদ্ধান্ত ৬০ বছরের পুরোনো প্রভাবশালী আঞ্চলিক জোট ইইউকে একটি বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার গণভোটের ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায় বিশ্ব অর্থনীতিতে। বিশ্বজুড়ে অর্থবাজার ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে ধস নামে। ডলারের বিপরীতে ব্রিটিশ পাউন্ড স্টার্লিংয়ের দাম নেমে আসে ১৯৮৫ সালের পর থেকে সর্বনিম্নে পর্যায়ে।
যুক্তরাজ্য ইইউর সঙ্গে থাকবে, নাকি এই জোট ছেড়ে বেরিয়ে যাবে—এ প্রশ্ন সামনে রেখে গণভোটে অংশ নিয়েছিলেন দেশটির নাগরিকেরা। ভোট পড়ে ৭২ শতাংশ। গতকাল শুক্রবার ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, মোট প্রদত্ত ভোটের ৫১.৯ শতাংশ অর্থাৎ ১ কোটি ৭৪ লাখ ১০ হাজার ৭৪২ জন ইইউ ছাড়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন। আর ইইউর সঙ্গে থেকে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৮.১ শতাংশ অর্থাৎ ১ কোটি ৬১ লাখ ৪১ হাজার ২৪১ জন।
মূলত ইইউর দেশগুলো থেকে উচ্চ হারে অভিবাসনের কারণে ব্রিটিশ জনগণের উদ্বেগ প্রশমিত করতে এ গণভোটের অঙ্গীকার করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। জোট ছাড়লে যুক্তরাজ্যের একঘরে হয়ে পড়া ছাড়াও তা অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে সতর্ক করে দিয়ে জোটে থাকার পক্ষে প্রচারণায় নেমেছিলেন তিনি। ভোটের ফল বলছে, অর্ধেকের বেশি ভোটার তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভোটের ফল নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন ডেভিড ক্যামেরন।
১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে ক্যামেরন সাংবাদিকদের বলেন, ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে প্রচার চালানোর পরও এ পক্ষ হেরে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পদে তাঁর আর থাকা উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন। নতুন নেতৃত্বের পথ তৈরি করে দিতে আগামী অক্টোবর নাগাদ তিনি সরে দাঁড়াবেন।
গণভোটের প্রচারণায় ব্রিটিশ জনগণ কার্যত দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাজ্যের গণভোটের এ ফল দেশটিকে তো বটেই, ইউরোপীয় ইউনিয়ন জোটকেই ভাঙনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশের উগ্র ডানপন্থী অভিবাসনবিরোধী সংগঠনগুলো নিজেদের দেশে অনুরূপ গণভোটের দাবি তুলেছে। তবে এটাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শেষের শুরু হিসেবে মানতে নারাজ ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান জ্যঁ ক্লদ-ইয়ুংকার।
ইউরোপীয় জোটের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে যুক্তরাজ্যসহ কোনো কোনো সদস্যদেশে অনেক দিন ধরেই সন্দেহ-সংশয় বিরাজ করছিল। তবে এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যই হবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করা প্রথম দেশ।
ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, ইইউ ত্যাগ করার কঠিন প্রক্রিয়াটি শুরু করা উচিত তাঁর উত্তরসূরির। ইইউ ত্যাগের পক্ষে প্রচার চালানো অন্যতম প্রধান নেতা লন্ডনের সাবেক মেয়র বরিস জনসনই ক্যামেরনের উত্তরসূরি হতে পারেন। তিনি বলেছেন, জোট ত্যাগের প্রক্রিয়া নিয়ে তাড়াহুড়োর কিছু নেই। তবে ইইউর নেতারা বলছেন, যুক্তরাজ্যের উচিত যত দ্রুত সম্ভব এ প্রক্রিয়া শুরু করা।
ইইউ ত্যাগের পক্ষে সক্রিয় আরেক নেতা ইউকে ইনডিপেন্ডেন্স পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজ বলেছেন, ‘২৩ জুন আমাদের ইতিহাসে স্বাধীনতা দিবস হয়েই থাকবে।’
গণভোটের এই রায়ের প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতার ওপরও। স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টারজন গতকাল বলেছেন, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে আবারও গণভোটের দাবি আরও জোরালো হলো। এ বিষয়ে ২০১৪ আয়োজিত প্রথম গণভোটে যুক্তরাজ্যে থেকে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল স্কটিশরা।
এদিকে, ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনার জন্য ইইউর নেতারা আগামী মঙ্গলবার দুই দিনের শীর্ষ বৈঠকে বসবেন।
ফল নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইইউ ত্যাগের পক্ষের লোকজন উল্লাসে মেতে ওঠেন। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারে এক পার্টিতে উল্লাসকারীদের চেঁচিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা জিতে গেছি।...আউট! আউট! আউট!’
তবে লন্ডনের আর্থিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থলে অনেককেই দেখা যায় ম্রিয়মাণ। ব্যাংক কর্মী ফ্রান্সেসকা ক্রিম্প কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, ভোটের এ ফলে তিনি শঙ্কিত। ক্রিম্প বলেন, ‘বহুজাতিক এই নগর একেবারেই বদলে যাচ্ছে। এতে নিজেকে একেবারেই বিধ্বস্ত মনে হচ্ছে। আমার চারপাশের দুনিয়াটা যেমন ছিল, তা আজ আর সে রকম নেই।’

0 comments :
Post a Comment