মিজান বাবু , নগরকান্দা (ফরিদপুর) :
ফসল উৎপাদনে ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানোর লক্ষে ফরিদপুরের নগরকান্দায় কৃষকরাই তৈরী করছে উন্নতমানের কেঁচো কম্পোষ্ট বা ভার্মি কম্পোষ্ট সার। কেঁচো কম্পোষ্ট সার ব্যবহার ও উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য প্রশিক্ষন, কেঁচো সরবরাহ, ঘর নির্মাণ সহায়তাসহ প্রাথমিক খরচ প্রদান করে উপজেলার কৃষকদের কেঁচো কম্পোষ্ট সার তৈরীতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ উপলক্ষে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর দ্বিতীয় শস্য বহুমূখী প্রকল্পের সহযোগিতায় ২০১৫ সালের মে মাস থেকে পরীক্ষামূলকভাবে নগরকান্দায় শুরু করেছে কেঁচো কম্পোষ্ট সার তৈরী।
নগরকান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশুতোষ কুমার বিশ্বাসের প্রচেষ্টায় উপজেলার সন্তষী গ্রামের রিপন শেখ, কোনাগ্রামের গোলাপী বেগম ও মনোহরপুর গ্রামের জুয়েল মিয়া সাতক্ষীড়া গিয়ে কেঁচো কম্পোষ্ট সার তৈরী করার যাবতীয় প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। এলাকায় এসে শুরু করেন কম্পোষ্ট সার তৈরীর কাজ। প্রকল্পের সহায়তায় রিপন শেখ ৫টি চাড়ি ব্যবহার করে এবং গোলাপী বেগম ৫টি চাড়ি ব্যবহার করে ভার্মি কম্পোষ্ট সার তৈরী করছেন। মনোহরপুরের বেকার যুবক জুয়েল মিয়া উপজেলা কৃষি অফিসারের পরামর্শে ও নিজ অর্থায়নে গড়ে তুলেছেন একটি বিশাল ডেইরী ফার্ম। এই ডেইরী ফার্মের গোবর এর সাহায্যে ৮০টি চাড়ি ব্যবহার করে তৈরী করছেন ভার্মি কম্পোষ্ট সার।
জানা গেছে, ফলমূলের খোসা, বাসি খাবার, রান্না ঘরের আবর্জনা, কাঁচা বা শুকনা পাতা, আগাছা, শাকসব্জির উচ্ছিষ্টাংশ, মুরগির বিষ্ঠা, গরু-মহিষের গোবরসহ বিভিন্ন পঁচনশীল জৈব পদার্থ বিশেষ প্রক্রিয়ায় কেঁচো দ্বারা সংগঠিত হয়ে জৈব পদার্থের পঁচনক্রিয়া ও তাপমাত্রা ও আদ্রতা নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে আবর্জনার যে চুড়ান্ত রূপ ধারন করে এবং এর মাধ্যমে যে সার প্রস্তুত করা হয় তাকে ভার্মি কম্পোষ্ট বা কেঁচো কম্পোষ্ট বলে। অর্থাৎ জৈব পদার্থ খাওয়ার পর কেঁচো যে মল ত্যাগ করে তাহাই কেঁচো কম্পোষ্ট বা ভার্মি কম্পোষ্ট নামে পরিচিত।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ফসল উৎপাদনে ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে এ সার অন্য যে কোনো সারের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকারি। মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাগুন বৃদ্ধি করতে এবং মাটির পানি ধারন ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। গাছের প্রয়োজনীয় ১৬টি খাদ্য উপাদানের অধিকাংশই এ সারের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব হয়। মাটির পিএইচ এর মাত্রা নিয়ন্ত্রনসহ মাটির বিষক্রিয়া দূর করতে কেঁচো কম্পোষ্ট সার খুবই কার্যকারি। এ সারের গুনাগুণ মাটিতে দীর্ঘদিন অবশিষ্ট থাকে বলে পরবর্তী ফসলে সারের পরিমান কম লাগে। সব রকমের গাছ ও ফসলে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ভার্মি কম্পোষ্ট ব্যবহারের ফলে ফসলের পুষ্টিমান অনেক বেড়ে যায়। এ সারের মধ্যে কিছু কোকুন থাকায় ফসলের জমিতে কেঁচোর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং এ সব কেঁচো মাটির অনুজীবগুলোকে কর্মক্ষম করে যা উদ্ভিদের জন্য খুবই উপযোগী।
কেঁচো কম্পোষ্ট সার জমি তৈরীর পর রাসায়নিক সারের মত ছিটিয়ে ও মাটির সাথে মিশিয়ে জমিতে ব্যবহার করতে হয়। প্রতি শতাংশ জমিতে প্রথম বছর ১৫ কেজি, দ্বিতীয় বছর ৭.৫ কেজি ও তৃতীয় বছর ৩.৭ কেজি হারে সার প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এভাবে কেঁচো সার তিন বছর ব্যবহার করলে পরবর্তী দুই বছর ঐ জমিতে তেমন সার ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না।
সফল কৃষক জুয়েল মিয়া বলেন, আমি বেকার ছিলাম। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে আমার বাড়িতে ডেইরী ফার্ম ও কেঁচো কম্পোষ্ট সার তৈরীর খামার করে আজ আমি স্বাবলম্বী। কেঁচো কম্পোষ্ট সার ব্যবহার করে কম খরচে আমি স্বাস্থ্যবান ফসল উৎপাদন করতে পারছি। এ ছাড়া, কম খরচে কম্পোষ্ট সার তৈরী করে তা বাজারে বিক্রি করে আমি লাভবান হয়েছি। আমার মত অন্যান্য কৃষকরা এগিয়ে আসলে এলাকায় কৃষি উন্নয়ন ও অর্থনৈতীক উন্নয়নের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
নগরকান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশুতোষ কুমার বিশ্বাস বলেন, বর্জ্য পদার্থ কাজে লাগিয়ে কেঁচো কম্পোষ্ট সার তৈরী ও বাজারজাত করে কৃষি ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটানো সম্ভব। কম খরচে রোগবালাই মুক্ত ও পুষ্টিমান সম্পন্ন ফসল উৎপাদন করতে কম্পোষ্ট সার খুবই উপযোগী। জমিতে কম্পোষ্ট সার ব্যবহার করা হলে মাটি স্থায়ী ভাবে কার্যক্ষমতা ফিরে পায়। কম্পোষ্ট সার তৈরী ও ব্যবহারে উপজেলার কৃষকদের সচেতন ও উৎসাহিত করার লক্ষে আমরা বিভিন্ন কর্মসুচি গ্রহন করেছি।



0 comments :
Post a Comment