ফরিদপুরে কবর থেকে বেঁচে ফেরা শিশুকে মৃত ঘোষণা : তদন্ত রিপোর্টে প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম অবহেলাকে দায়ী

ফরিদপুর :
ফরিদপুরে গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালে এক নবজাতকে (গালিবা হায়াত) মৃত ঘোষণা করা এবং ৬ ঘন্টা পর দাফনের সময় কেঁদে ওঠার ঘটনায় গঠিত তিনটি তদন্ত কমিটির মধ্যে দুটি কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে।

রোববার জেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত কমিটি ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক বেগম উম্মে সালমা তানজিয়ার নিকট প্রতিবেদন জমা দেন। একই দিন সিভিল সার্জন কর্তৃক গঠিত কমিটি ফরিদপরের সিভিল সার্জন অরুণ কান্তি বিশ্বাসের নিকট প্রতিবেদন তুলে দেয়।

জেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত ছয় সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছেন ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কে এম কামরুজ্জামন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কে এম কামরুজ্জামান  এ বিষয়ে  সাংবাদিকদের জানান, এ ঘটনার জন্য কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে চরম উদাসীনা এবং ওই সময়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের অবহেলাকে চিহ্নিত করেছে।
এ কমিটি যে সুপারিশ করেছে সেগুলো হলো, ১। হাসপাতালে আসন না থাকা সত্ত্বেও রোগী ভর্তি করা হয়, পরবর্তিতে ভর্তি বাতিল করা হয়। বাচ্চা প্রসবের পর আবার রোগীকে সিটে উঠানো হয়, এর দ্বারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে চরম উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়।  ২। হাসপাতালে ইনডোর চিকিৎসক নেই। গাইনি বিভাগে দিনে চিকিৎসক থাকলেও রাতের জন্য কোন চিকিৎসক নেই। গাইনি বিভাগের ব্যবস্থা যথোপযুক্ত নয়। ৩। হাসপাতালে নিবন্ধিত গাইনোকলজি বিভাগ আছে কিন্তু স্থায়ী চিকিৎসক নেই, শুধুমাত্র অপারেশন থিয়েটার ও কেবিন ভাড়া দেওয়ার মধ্যে একটি হাসপাতালের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এবং ৪। স্থায়ী সার্বক্ষণিক চিকিৎসক পদায়ন না করে গাইনোকলজি বিভাগটি চালু রাখা সঠিক নয়।

অপরদিকে সিভিল সার্জন কর্তৃক গঠিত তিন সদস্যের কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছেন ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের কনসালটেন্ট ঊষা রঞ্জন চক্রবর্ত্তী। তিনি জানান, রোববার দুপুরে প্রতিবেদন সিভিল সার্জনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
সিভিল সার্জন অরুণ কান্তি বিশ্বাস বলেন, কমিটি ওই দিনে সংঘটিত ঘটনাসহ হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনার ব্যাপারেই তদন্ত করেছে। কমিটি সমস্যা চিহ্নিত করা ও সুপারিশসহ মোট  ১০টি বিষয় সনাক্ত করেছে। 
এগুলো হলো, ১। গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে ওই হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, সেবিকা, আয়া বা নৈশ্য প্রহরি কেউ সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করেনি। ২। হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোন ব্যবস্থাপনা নেই। ৩। হাসপাতালে গাইনি বিভাগের অনুমতি থাকলেও নিয়মিত গাইনি চিকিৎসক নেই। ৪। প্রসূতি বিভাগের ব্যবস্থাপনা ব্যাপারে ডা. রিজিয়া আলম তার সহকারি ডা. মোসলেমা হোসেন এবং ডা. আফরোজা পারভীন ও তিনজন নার্স মিঠু রানী সুত্রধর, আসিয়া খাতুন ও আখিনূর আক্তার এবং কিনার হাসি নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন। ৫। উপরস্তু বাচ্চাটির হাসপাতাল ত্যাগের সময় সনদপত্র ছাড়া হাসপাতাল ত্যাগে উক্ত রাতে দায়িত্বরত ফটক নিরাপত্তা প্রহরির দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে। মৃত সনদপত্র ছাড়া কোন রোগী হাসপাতাল ত্যাগ করে যাতে যেতে না পারে সে ব্যপারে কযকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ৬। রোগী ভর্তি জরুরী বিভাগের মাধ্যমেই হতে হবে, যা ওই হাসপাতালে নেই। ৭। প্রতি মাসে ব্যবস্তাপনা কমিটি সভা করবে এবং তাতে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধি থাকতে হবে। ৮। হাসপাতালটি একশ শয্যার বলা হরেও জনবল অপ্রতুল। দ্রুত এ ব্যাপারে কার্যকরি ব্যবস্থা নিতে হবে। ৯। গাইনী বিভাগের কোন কনসালটেন্ট ও মেডিকেল চিকিৎসক আলাদা ভাবে নির্ধারিত নাই, তার ব্যবস্থা করতে হবে। ১০। জরুরী বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগে নিয়ম বহিভুত ভাবে টাকা নেওয়া হচ্ছে এবং প্রতি বছর সরকার প্রদত্ত অনুদান কোন খাতে কিভাবে খরচ করা হচ্ছে তার কোন হিসেব নেই।

দুটি তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আ স ম জাহাঙ্গীর চৌধুরী বলেন, আমি প্রতিবেদন পেয়েছি। এ ব্যাপরে নির্বাহী কমিটির জরুরী সভা আহ্বান করে প্রতিবেদন দুটি আলোচনা করে এ ব্যাপরে মতামত দেব।

এ ঘটনাটি সম্পর্কে মোট তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মো আবুল কালাম আজাদের নির্দেশনায় এ ঘটনা তদন্তে রাজবাড়ী জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো.রহিম বক্সকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তৃতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নিকট প্রতিবেদন জমা দেবে।

এবিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক বেগম উম্মে সালমা তানজিয়া বলেন, নবজাতক মৃত ঘোষনার তদন্ত রিপোর্ট আমি হাতে পেয়েছি। তিনি বলেন খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই রিপোর্টটির পর্যালচনা করে উদ্ধর্তন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হবে। 

উলেখ্য,ফরিদপুর শহরের কুঠিবাড়ী কমলাপুর এলাকার বাসিন্দা  ফরিদপুর জেলা ক্রিকেট দলের  সদস্য নাজমুল হুদা মিঠুর স্ত্রী অ্যাডভোকেট নাজনীন আক্তার পপি অন্তঃসত্তা ছিলেন। প্রসব বেদনায় কাতর পপিকে গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে স্বজনরা তাকে শহরের ডা. জাহেদ মোমেরিয়াল শিশু হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে গাইন বিভাগে নিয়ে  চিকিৎসক রিজিয়া আলম তাকে শয্যা সঙ্কটের কথা বলে ভর্তি নিতে চায়নি। এর এক পর্যায়ে পপি ওই চিকিৎসকের কে একটি কন্যা সন্তান প্রসব করেন। চিকিৎসক রিজিয়া আলম নবজাতককে দেখে নাড়ি না পেয়ে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এর ৬ ঘন্টা পর কবরে নামানোর সময় নবজাতকটি কেদে উঠে।

Share on Google Plus

About faridpur info 24

Faridpurinfo24.com-ফরিদপুরের তথ্য বাতায়নে আপনাদের স্বাগতম। ফরিদপুরের সকল খবরাখবর আপনাদের কাছে পৌছে দিতেই আমাদের এই প্রয়াশ। আপনার সকল মতামত ও বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন। সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. মনিরুল ইসলাম টিটো ফরিদপুর । মোবাইল: ০১৭১৬৩৪৬০৩০

0 comments :

Post a Comment