ক্যান্সার আক্রান্ত রেখা রানীর স্বপ্নের স্কুল দাঁড়িয়ে যেখানে..

সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন ক্যান্সার আক্রান্ত এক নারী। নাম রেখা রানী ওঝা। নিজের নামে প্রতিষ্ঠা করা কুমারী রেখা রানী নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে লেখাপড়া করছে এলাকার শতাধিক মেয়ে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার এই সাহসী নারী এখন অনেকের জন্যই প্রেরণা ।

রেখা রানী ওঝা কোটালীপাড়া উপজেলার রুরুয়া গ্রামের বাসিন্দা । সারা জীবন কেটেছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। কুমারী জীবনেই থেকে গেছেন ।সংসার পাতা হয়নি, কপালে সিঁদুর ওঠেনি। পরিবারে রয়েছে মা এবং আরো তিন বোন ও দুই ভাই। বাবা বেঁচে নেই। ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড় তিনি। ১৯৪৮ সালে জন্ম তার। লেখা-পড়া শেষ করেছেন নিজের চেষ্টায়। পড়ালেখা শেষ করে দীর্ঘদিন করেছে নার্সের চাকরি । দীর্ঘ ২৮ বছরের চাকরি জীবন শেষে পেনশনের টাকা দিয়ে নিজের গ্রামেই গড়ে তোলেন কুমারী রেখা রানী নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়।


কোটালীপাড়া উপজেলায় এই বিদ্যালয়টি নিয়ে মাত্র দুটি বালিকা বিদ্যালয় । এলাকার নারী শিক্ষা উন্নয়নে ভূমিকা রাখতেই রেখা রানী বিদ্যালয়টি স্থাপন করেছেন। স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছ নেওয়া হয় না বেতন। আবার বিদ্যালয়টির নানা খরচও চালান এই নারী। নিজের কোন উত্তরাধিকার না থাকায় তার সারা জীবনের ধ্যান-জ্ঞান এই বিদ্যালয়টি। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি দেওয়া হচ্ছে অন্যান্য শিক্ষা।

বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর রেখা রানী ওঝাকে সভাপতি করে ৯ সদস্যের স্কুল পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৫ সালে রেজিষ্ট্রেশনের জন্য আবেদন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসনের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক শেখ মো: আব্দুল্লাহ মিয়া একটি সুপারিশও পাঠান। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রাণালয় ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বিদ্যালয় রেজিষ্ট্রশন করা সাময়িক ভাবে স্থগিত করলে ভেস্তে যায় সব কিছুই। ২০১৬ সালের ২৫মে বিদ্যালয়টি রেজিষ্ট্রেশনের জন্য ফের সুপারিশ পাঠান জেলা প্রশাসক মো: খলিলুর রহমান। লাভ হয়নি ।


তাই বলে থেমে নেই শিক্ষা কার্যক্রম। পাঠ দানের অনুমতি না থাকায় বিদ্যালয়রে শিক্ষার্থীরা সরাসরি দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষা এসএসসিতে অংশ নিতে পারে না। দূর্ভাগ্য, অন্য স্কুলের মাধ্যমে রেজিষ্ট্রেশন করে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের ।

এলাকার বাসিন্দা প্রমথ রঞ্জন দত্ত, মধুসূদন হালদার, পবিত্রা মজুমদার, শংকরী হাজরা জানান, সারা জীবনে রেখা রানী কারো কাছ থেকে কিছু নেননি। শুধু দিয়ে গেছেন। তিনি যে বিদ্যালয়টি গড়ে তুলেছেন তা যেন এলাকাবাসীর উপকারে আসতে পারে তার জন্য এলাকাবাসীও তাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।


ওই বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী রিপা বাড়ৈ, ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী সুইটি হালদার, ৭ম শ্রেণির ছাত্রী তন্দ্রা হালদার, আখি বালা এরা জানান, বিদ্যালয়ে তাদেরকে শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই নয়, পাশাপাশি নিজেদের জীবন গড়তে নানা শিক্ষাও দেওয়া হয় ।

ওই স্কুলের কৃষি বিভাগের শিক্ষক সুব্রত কুমার ওঝা বলেন, ‘এ নারী  নিজের কথা চিন্তা না করে এলাকার নারীদের কথা চিন্তা করেছেন। তাদের শিক্ষা মুক্তির কথা ভেবেছেন। তার এ মুক্ত চিন্তার কথা বিবেচনা করে এ স্কুলে শিক্ষকতা করছি। আমাদের কোন বেতন না দিলেও আমার হাসি মুখে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছি। মনে হচ্ছে আমি একটি ভাল কাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’


সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষিকা স্মৃতি বসু বলেন, ‘তার এ উদ্যোগের কথা জানার পর আমি এ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে ভাল কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের কোন বেতন দিতে না পারলেও আমাদের কোন কষ্ট নেই। একটি ভাল কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এনিয়ে আমার পরিবারেও কোন অভিযোগ নেই।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পংকজ কুমার বৈদ্য বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোন বেতন নেওয়া হয়না। বিদ্যালয়টির নানা খরচও চালান এই নারী। নিজের কোন উত্তরাধিকার না থাকায় তার সারা জীবনের ধ্যান-জ্ঞান এই বিদ্যালয়টি। এখানকার শিক্ষার্থীদের মাঝেই তিনি বেঁচে থাকতে চান। বিদ্যালয়ের যে ক’জন শিক্ষক রয়েছেন তারাও অনেকটা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। তবে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও পাঠদানের অনুমতি পায়নি। যে কারণে পরীক্ষা দেওয়ার সময় অন্য বিদ্যালয়ের হয়ে অংশ নিতে হচ্ছে। এসমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সরকারের সহযোগীতা চান তিনি।’


রেখা রানী ওঝার ছোট বোন মিনা রানী ওঝা বলেন, ‘বাবা মারা যাবার সময় আমরা সবাই ছোট ছিলাম। সংসারের দ্বায়িত্ব ছিল বোনের উপর। সংসারের কথা, আমাদের কথা চিন্তা করে জীবনে বিয়ে করেননি। কুমারী থেকে গেছেন। তার স্বপ্ন ছিল একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার। তিনি সেটা করতে পেরেছেন।’


কলাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাইকেল ওঝা বলেন, ‘বিদ্যালয়টি একটি নিচু এলাকায়  নির্মিত হয়েছে। ফলে বর্ষাকালে তলিয়ে যেত। এতে নৌকায় করে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসার সময় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হত। পরিষদের ৪০ দিনের কর্মসূচীর আওতায় একটি কাঁচা রাস্তা ও এডিবি থেকে একটি ক্লাশ রুম করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া খালের উপর একটি কালভার্টও নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে।’

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ক্যান্সার আক্রান্ত রেখা রানী ওঝা বলেন, ‘বিদ্যালয়টি আমার স্বপ্নের বাস্তবায়ন। আমি চেয়েছিলাম এলাকার নারী সমাজের জন্য কিছু একটা করবো। সারা জীবন আমি কারো কাছ থেকে কিছু চেয়ে নেইনি। সংগ্রাম করে আমি আমার অধিকার কেড়ে নিয়েছি। নিজের সঞ্চয়ের অর্থ দিয়ে এলাকার মেয়েদের জন্য এই বিদ্যালয়টি স্থাপন করেছি। এ বিদ্যালয়টির মাধ্যমেই আমি সবার মাঝে বেঁচে থাকতে চাই।’

কি ভাবে তার চিকিৎসা চলছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০০০ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হই। ব্রেনে একটি টিউমারও ধারা পরে। পরে জায়গা জমি বিক্রি ও ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা খরচ করে চিকিৎসা করি। এখন কিছুটা ভাল। বছরখানেক আগে আমার গলায় আরো একটি টিউমার ধরা পরে। এজন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের শরনাপন্ন হই। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া আমার চিকিৎসা করতে রাজি হননি। যে পরিমাণ চিকিৎসা ভাতা পাচ্ছি তা দিয়ে চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। তাই এখন তার চিকিৎসা করছি না।’

কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিলাল হোসেন রেজিস্ট্রেশনের বিষয়ে বলেন, ‘বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সকল শর্ত পূরণ করা হলে রেজিষ্ট্রশন দেওয়া সম্ভব হবে।’
Share on Google Plus

About faridpur info 24

Faridpurinfo24.com-ফরিদপুরের তথ্য বাতায়নে আপনাদের স্বাগতম। ফরিদপুরের সকল খবরাখবর আপনাদের কাছে পৌছে দিতেই আমাদের এই প্রয়াশ। আপনার সকল মতামত ও বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন। সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. মনিরুল ইসলাম টিটো ফরিদপুর । মোবাইল: ০১৭১৬৩৪৬০৩০

0 comments :

Post a Comment