ফরিদপুর তথা দেশের অহংকার শামসুদ্দীন মোল্লা

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অ্যাডভোকেট শামসুদ্দীন মোল্লা দেশের সংবিধান প্রণেতাদেরও একজন। খসড়া সংবিধান রচনা কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি অনন্য অবদান রেখেছেন। জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি ফরিদপুরের আঞ্চলিক রাজনীতিতে তার ভূমিকা ছিল কিংবদন্তির মতো।

জম্ন ও বংশ পরিচয়: ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার সদরদী গ্রামে খ্যাতনামা রাজনীতিক শামসুদ্দীন মোল্লার জন্ম ১৯২১ সালের ২০ এপ্রিলে।

শিক্ষাজীবন:  ভাঙ্গা পাইলট হাইস্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৪১ সালে। ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে এক বছর অধ্যয়নের পর শামসুদ্দীন মোল্লা কলকাতার সুরেন্দ্রমোহন কলেজ থেকে ১৯৪৪ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন এবং স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৪৬ সালে।

বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচয়:  বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী হওয়ার কারনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শামসুদ্দীন মোল্লার পরিচয় স্কুল জীবন থেকেই। ইসলামিয়া কলেজে শিক্ষাগ্রহণ এবং বেকার হোস্টেলে অবস্থানকালে সে পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়। বঙ্গবন্ধু তার কলেজ জীবনে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে শামসুদ্দীন মোল্লা নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত হন। ওই সময় তারা জননেতা হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর সানি্নধ্যে আসেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শামসুদ্দীন মোল্লাও ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে বকশীবাজারের ইকবাল হলের (নর্থ) আবাসিক ছাত্র হন। শামসুদ্দীন মোল্লার সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন তার ইসলামিয়া কলেজের সহপাঠী অভিন্ন রাজনৈতিক পথের পথিক সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন। 


কর্মজীবন: ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত শামসুদ্দীন মোল্লা ঢাকা এবং ফরিদপুরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ফরিদপুরে স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ১৯৫৬ সাল থেকে ফরিদপুরে আইনব্যবসা এবং দৈনিক ইত্তেফাকের নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফরিদপুর প্রেসকাবের সভাপতি হিসেবেও দ্বায়িত্ব পালন করেন তিনি।

রাজনৈতিক জীবন: শামসুদ্দীন মোল্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৪ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। এর মধ্যে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে যান। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের সূচনাপর্বে তিনি একাগ্রভাবে অংশ নেন। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে মুসলিম লীগ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ও তার অনুসারীদের মোহভঙ্গ হয়। ১৯৪৯ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু নব গঠিত দলের যগ্ম সম্পাদক পদের দায়িত্ব পান। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু শামসুদ্দীন মোল্লা দলের নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য হন।

দায়িত্বপালন: শামসুদ্দীন মোল্লা দীর্ঘকাল ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে ছয় দফা দাবি জনগণের কাছে পেঁৗছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে জড়ানো হলে তার মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শামসুদ্দীন মোল্লা জাতীয় সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানি শাসকরা বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায় এবং ২৫শে মার্চ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শামসুদ্দীন মোল্লা নিবেদিতপ্রাণ হয়ে তা সংগঠনের প্রয়াস নেন। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে তিনি অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন।

সংবিধান প্রনেতা: স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যে কমিটি গঠিত হয়, শামসুদ্দিন মোল্লা ছিলেন তার অন্যতম সদস্য।

সংসদ সদস্য: ১৯৭৩ সালে তিনি বিপুল ভোটে পুনরায় জাতীয় সংসদসদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হলে শামসুদ্দীন মোল্লা ফরিদপুর জেলার গভর্নর নিযুক্ত হন।

স্ত্রীর কাছে চিঠি:  ১৯৭৫ সালের ৪ঠা নভেম্বরে বঙ্গবন্ধু-হত্যার প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকায় যে মিছিল বের হয় তার পুরোভাগে ছিলেন শামসুদ্দীন মোল্লা। ৭ই নভেম্বর ক্ষমতা পরিবর্তনের পর শাসক শ্রেণীর চাপের মুখে পড়েন তিনি। এ সময় তিনি ভারতে আশ্রয় নেন।
এ সময় তিনি তার সহধর্মিনী বেগম যোবায়দা শামসুদ্দীনকে চিঠি লেখেন তাতে সে চিঠির কিছু অংশ_ 'আমি খোদার উপর ভরসা রেখে দেশের এবং দশের দিকে চেয়ে অনির্দিষ্ট পথে পা বাড়ালাম_ জানিনা খোদা কপালে কি রেখেছেন? জীবনে আর সংসার হবে কিনা তা রাব্বুল আলামিনই জানেন। তুমি ছেলেমেয়েদের নিয়ে খুব সাবধানে থেকো। এখন তুমিই ওদের বাবা-মা উভয়ই। জানতো আমি ওদেরকে কত ভালবাসি, স্নেহ করি কিন্তু কি করবো সব মায়া কাটিয়ে চললাম। খোদার নিকট অনবরত দোয়া করো এবং ওদেরকে দোয়া করতে বলো_ যেন বিজয়ীর বেশে পুনরায় তোমাদের সবার সঙ্গে মিলতে পারি।'

ইন্তেকাল: ১৯৯১ সালের ১০ জুলাই জীবনের পরপারে চলে যান রাজনীতির এই কিংবদন্তী। তার মৃত্যুতে একটি যুগের পতন ঘটে। এই মহীরূহের 25তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা।




তথ্যসূত্র: ওয়েবসাইট
লেখক : প্রকৌশলী সাজিয়া শারমিন কেয়া

সম্পাদনা : মাহফুজ মাসউদ
Share on Google Plus

About faridpur info 24

Faridpurinfo24.com-ফরিদপুরের তথ্য বাতায়নে আপনাদের স্বাগতম। ফরিদপুরের সকল খবরাখবর আপনাদের কাছে পৌছে দিতেই আমাদের এই প্রয়াশ। আপনার সকল মতামত ও বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন। সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. মনিরুল ইসলাম টিটো ফরিদপুর । মোবাইল: ০১৭১৬৩৪৬০৩০

0 comments :

Post a Comment